বাণিজ্যিক দুনিয়ায় গ্রাহক আকর্ষণ করার চেয়ে তাদের ধরে রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকর। কারণ নতুন একজন ক্রেতাকে আকর্ষণ করতে যতটুকু সময়, অর্থ ও প্রচেষ্টা লাগে, তার তুলনায় একজন পুরনো ক্রেতাকে আবার কেনাকাটায় আগ্রহী করে তোলা অনেক সহজ ও লাভজনক। এই ক্রেতারা বারবার ফিরে আসেন এবং একটি ব্র্যান্ডের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস গড়ে তোলেন, যা ব্যবসায়ের ধারাবাহিকতা ও প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।
স্ট্যাটিসটিক্যালি বলা হয়ে থাকে, যে ক্রেতা একবার কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা গ্রহণ করে সন্তুষ্ট হন, তার ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে প্রায় ৬০-৭০% পর্যন্ত। অন্যদিকে নতুন ক্রেতাকে রূপান্তর করার হার অনেক কম — মাত্র ৫-২০%। এ কারণেই “Repeat Buyers” বা পুনরায় কেনাকাটাকারী ক্রেতারা শুধু আয় বৃদ্ধি করে না, ব্র্যান্ডের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, পরিচিতি ও বাজার দখলের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে তোলে।
Repeat Buyers ও ব্র্যান্ডের লাভজনকতা
একজন Repeat Buyer মানেই শুধু আরেকটি বিক্রয় নয়, বরং ধারাবাহিক বিক্রয়ের প্রতিশ্রুতি। তারা অনেক সময় অফার ছাড়াও পণ্য বা সেবা কেনেন, কারণ তাদের মনে একটি আস্থা ও সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই সম্পর্ক একটি কোম্পানির জন্য অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ। কারণ:
- তারা সাধারণত বেশি খরচ করেন।
- প্রচারণার জন্য বাড়তি খরচ লাগে না।
- তারা অন্যান্যদের কাছে সুপারিশ করেন, ফলে নতুন গ্রাহক আসে।
- দাম নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করেন না।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একজন Repeat Buyer নতুন একজন গ্রাহকের তুলনায় ৬৭% বেশি খরচ করে এবং তাদের প্রতি মার্কেটিং খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অর্থাৎ, একই পণ্য বিক্রয় করতে যেখানে নতুন গ্রাহকের পেছনে বিজ্ঞাপন, ইমেল ক্যাম্পেইন ইত্যাদিতে খরচ হয়, পুরনো ক্রেতার জন্য সেটি প্রাকৃতিকভাবেই ঘটে।
গ্রাহকের মনস্তত্ত্ব ও কেন তারা বারবার ফিরে আসে
ক্রেতারা তখনই বারবার ফিরে আসেন যখন তারা তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হন। এটি মূলত চারটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:
- বিশ্বাস: গ্রাহক মনে করেন, এই ব্র্যান্ড তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।
- সন্তুষ্টি: প্রোডাক্ট/সার্ভিস তাদের প্রত্যাশা পূরণ বা অতিক্রম করেছে।
- সহজতা: অর্ডার, ডেলিভারি ও কমিউনিকেশন প্রক্রিয়াগুলো সহজ ও স্বচ্ছ।
- সম্পর্ক: ব্র্যান্ডের সাথে একটা আবেগিক সংযোগ তৈরি হয়েছে।
বাজারে পণ্য ও সেবার অভাব নেই। কিন্তু একজন গ্রাহক যখন মনে করে এই ব্র্যান্ড আমাকে বোঝে এবং আমার প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া দেয়, তখনই তার মাঝে স্বাভাবিকভাবেই লয়্যালটি তৈরি হয়। এ কারণেই কোম্পানিগুলোর উচিত শুধু বিক্রি নয়, বরং সংযোগ তৈরি করার দিকে মনোযোগ দেওয়া।
Customer Relationship Building: সংজ্ঞা ও তাৎপর্য
Customer Relationship Building অর্থ হলো গ্রাহকের সাথে এমন একটি যোগাযোগ তৈরি করা যা নিরবিচারে নির্ভরতা, পছন্দ ও বিশ্বাসের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। এটি শুধুমাত্র একবারের লেনদেন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক যা একাধিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয় — যেমন বিক্রয়ের আগে, বিক্রয়ের সময় এবং বিক্রয়ের পর।
এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান কাস্টমার সার্ভিস টিম, সিআরএম সফটওয়্যার এবং ইমেল রিমার্কেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে এই সম্পর্ক বজায় রাখে। যদি একটি কোম্পানি গ্রাহকের প্রোফাইল, ক্রয়ের ইতিহাস ও আগ্রহকে বুঝে তাদের সাথে কথা বলে, তবে গ্রাহকের মনে হয় “এই ব্র্যান্ড আমাকে চেনে।” এটি হল সম্পর্ক গঠনের মূল চাবিকাঠি।
ব্র্যান্ড লয়্যালটি বনাম Relationship Marketing
অনেক সময় মনে হতে পারে যে ব্র্যান্ড লয়্যালটি ও কাস্টমার রিলেশনশিপ বিল্ডিং এক জিনিস। তবে বাস্তবে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
ব্র্যান্ড লয়্যালটি মানে একজন গ্রাহক স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকেই বারবার পছন্দ করেন।
Relationship Marketing মানে কোম্পানি সচেতনভাবে গ্রাহকের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে, যার ফলে ক্রেতা ব্র্যান্ডের প্রতি অনুরক্ত হন।
দুটি কৌশল একে অপরের পরিপূরক। ভালো সম্পর্ক ছাড়া ব্র্যান্ড লয়্যালটি আসে না, আবার শুধু লয়্যালটি থাকলে সম্পর্ক থাকবেই এমন নয়।
Repeat Buyers গঠনের কৌশলসমূহ
১. প্রিমিয়াম কাস্টমার সার্ভিস
একজন গ্রাহক যখন কোনো সমস্যায় পড়ে এবং সঠিকভাবে সমাধান পায়, তখন তার মনে থাকে যে এই ব্র্যান্ড তার কথা শুনেছে। সময়মতো রিপ্লাই, বিনয়ী আচরণ এবং সমস্যা সমাধানে আন্তরিকতা তাকে ভবিষ্যতের জন্য আশ্বস্ত করে।
২. পার্সোনালাইজড অভিজ্ঞতা
যদি একজন ক্রেতাকে তার নাম ধরে ইমেইল পাঠানো হয়, তার গত লেনদেন অনুযায়ী অফার দেওয়া হয়, তাহলে সে মনে করে এই ব্র্যান্ড তাকে গুরুত্ব দেয়। এটি কাস্টমার-সেন্ট্রিক মার্কেটিংয়ের একটি বড় অংশ।
৩. নিয়মিত ফলোআপ এবং রিমাইন্ডার
গ্রাহকের কাছে শুধু বিক্রির সময় যোগাযোগ না করে সময় সময় তাকে শুভেচ্ছা জানানো, তার বিশেষ দিনে অফার পাঠানো তাকে আবেগিকভাবে যুক্ত রাখে।
৪. লয়্যালটি প্রোগ্রাম ও রিওয়ার্ড সিস্টেম
নির্দিষ্ট সংখ্যক অর্ডারের পর ডিসকাউন্ট, রিওয়ার্ড পয়েন্ট, প্রিভিলেজ অ্যাকসেস — এগুলো Repeat Buyers তৈরির শক্তিশালী উপায়।
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে Relationship Building-এর ভূমিকা
বর্তমানে ই-কমার্স ও অনলাইন মার্কেটিংয়ের যুগে সম্পর্ক তৈরি অনেকটাই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। তবে তা ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রযুক্তি শুধু মাধ্যম, আসল হলো মনোভাব।
- ইমেইল মার্কেটিং: কাস্টমাইজড ইমেইলের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে টাচে থাকা যায়।
- সোশ্যাল মিডিয়া: মন্তব্যের উত্তর দেওয়া, লাইভে আসা, ফিডব্যাক নেওয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক শক্তিশালী হয়।
- চ্যাটবট/লাইভ চ্যাট: ২৪/৭ সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে গ্রাহকের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায়।
গ্রাহক রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (CRM) এর গুরুত্ব
CRM মানে শুধু সফটওয়্যার নয়, বরং একটি দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে প্রতিটি গ্রাহককে আলাদাভাবে বোঝা ও সেবা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ব্যবসা গ্রাহকের পূর্বের অর্ডার, পছন্দ, অভিযোগ, ক্লিক হিস্টোরি সব কিছু ধরে রাখে। ফলে ভবিষ্যতের সেবাদান আরও প্রাসঙ্গিক হয়।
Repeat Buyers ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
বাজারে প্রতিযোগিতা, দামের লড়াই, নতুন অফারের ঝড় — এসবের মাঝে একজন ক্রেতাকে ধরে রাখা সবসময় সহজ নয়। তবে কিছু চ্যালেঞ্জের সমাধান করা যায় কৌশলীভাবে:
- সমস্যা: প্রোডাক্ট কোয়ালিটি কমে যাওয়া
সমাধান: নিয়মিত মান যাচাই ও আপডেট - সমস্যা: নতুন কোম্পানির অফারে তারা আকৃষ্ট হয়ে পড়া
সমাধান: লয়্যাল ক্রেতাদের জন্য এক্সক্লুসিভ বেনিফিট - সমস্যা: কাস্টমার সার্ভিসের অভাব
সমাধান: ২৪/৭ সহায়তা টিম গঠন
Repeat Buyers থেকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর গঠনের রূপরেখা
যখন একজন Repeat Buyer দীর্ঘদিন ধরে সন্তুষ্ট থাকেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই ব্র্যান্ডের প্রচারক হয়ে যান। তাকে বিশেষ সুযোগ দেওয়া, রিভিউ চাওয়া, রেফারেল বোনাস দেওয়া তার অংশগ্রহণ বাড়িয়ে তোলে। এটি Word-of-Mouth মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ।




